Search
Close this search box.

জীবন দর্শন

“বিরোধিতা যদি হয় ‘মাও’, আমাকে সে আখ্যাই দাও”

নিরীশ্বরবাদী

সজ্ঞানে, সচেতনভাবে আমি জানাচ্ছি যে আমি আর নিজেকে মুসলিম বা কোনও বিশেষ ধর্মসম্প্রদায়ের অংশ বলে আর মনে করি না। ভারতে যা হয়ে চলেছে, যেভাবে দলিত সম্প্রদায়কে নানাভাবে অপমান করা হচ্ছে তাতে আমি ‘মুসলমান’ থাকলে আর বর্ণহিন্দুদের সম্পর্কে কিছু বলতে পরব না। বললেই এক শ্রেণীর মানুষ আমায় সাম্প্রদায়িক ছাপ দেবে।
আমি মনে করি না ঈশ্বরে (আল্লায় বা ইশ্বরকে যিনি যে নামেই ডাকুন তাঁকে) আমার কোনও প্রয়োজন আছে। বারবার আমারই দেশের এই দলিত পরিবারের ছবি দেখছি, ভিডিওটাও দেখছি আর মনে হচ্ছে কোথায় পরমেশ্বর। কোথায় কে। সারা ব্রহ্মাণ্ড যিনি সৃষ্টি করেছেন তাঁকে কি মঙ্গলময় বলা যাবে। আমি অন্তত আর বলতে পারব না। আমি নিরীশ্বরবাদী।

কিন্তু যাঁরা কোনও ধর্মে, ধর্মমতে বিশ্বাস করেন বা যাঁরা আস্তিক তাঁদের প্রতি আমি কোনও বিরূপ ধারণা পোষণ করছি না। তাঁদের সম্পর্কে আমার কিছু বলার নেই। আমি মনে করছি না তাঁরা কোনও ভুল করছেন। ওটা তাঁদের ব্যাপার।
২০০০ সালের মে মাসে ভারত রাষ্ট্রের প্রথম শ্রেণীর এক ম্যাজিস্ট্রেটের এজলাসে এফিডেভিটের মাধ্যমে আমি আমার নাম পরিবর্তন করেছিলাম। এমন নাম নিয়েছিলাম যাতে কোনও বিশেষ Religion বা Caste-এর চিহ্ন নেই। কবীর নামটিতে ইসলামও নেই, হিন্দু মতবাদও নেই। আর সুমন আমার বাবামায়ের দেওয়া নাম। তাতেও কোনও বিশেষ Religion-এর চিহ্ন নেই। আমার First Name: Kabir; Surname: Suman. পাসপোর্ট, PAN কার্ড, ব্যাংক একাউন্ট, ভোটার আই ডি সর্বত্র এই কবীর সুমন, Kabir Suman নামই আছে। আমার এই নামই থাকবে, কিছু পাল্টাবে না।

কেউ যদি মনে করেন যে এখন আমি কোনও বিশেষ Religion-এর মধ্যে নেই এবং আমি নিরীশ্বরবাদী বলে আমাকে আবার আগের নামে ডাকা যাবে তো তিনি ভুল করবেন, তদুপরী সেটা ‘বে-আইনি’ও হবে। ওই নামটি আমি আইনত ত্যাগ করেছি ২০০০ সালের মে মাসে। তার পর থেকে ওটা আর আমার নাম নয়। আমার নাম কবীর সুমন। আজ যদি আমার সন্তান হয়, তাঁর পদবি “সুমন” হতে পারে যদি তিনি সেটা চান। অনুগ্রহ করে কোনও সুধী বঙ্গ-সহনাগরিক আমার নাম নিয়ে গোলমাল পাকাবেন না। এই গোলমাল বা পেজোমি আমি কোনও অ-বাঙালিকে পাকাতে দেখিনি।

সুমনের ফেসবুক পোষ্ট থেকে…

*******************************

বাংলাদেশ সম্পর্কে কিছু কথা…

আমার মায়ের বাবা, আমার নানা, ছিলেন যশোরের ছেলে। যৌবনেই কলকাতা চলে আসেন। মায়ের কাছে শুনেছি পদ্মাপার না হ’লে পূর্ববঙ্গীয় নয়। যশোর আজ বাংলাদেশে। তাহলে আমার পূর্বপুরুষ-রমনীদের অর্ধেক বাংলাদেশের। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর আমার বড় ভাই আর আমি ঠিক করেছিলাম বাংলাদেশের নাগরিকত্ব নেব। পরে চেষ্টাও করেছিলাম। ক্মল কুমার মজুমদার লিখেছিলেন: “মানুষের দেহে মানুষের মুখের যে গুরুত্ব, মানুষের মুখে মানুষের ভাষারও সেই গুরুত্ব।” সেই দিক দিয়ে আমি কোনওদিনই ভারতের সঙ্গে একাত্ম হতে পারিনি। একাত্ন হতে পেরেছি বরং বাংলাদেশের সঙ্গে। “এ-যদি আমার দেশ না হয় তো কার দেশ বলো” – এমন একটা কথা আমি ভারত সম্পর্কে বলতে পারিনি। পেরেছি বাংলাদেশ সম্পর্কে বলতে। নিকারাগুয়ার বিপ্লবী সরকারের আমন্ত্রণে ও বদান্যতায় যখন নিকারাগুয়ায় যাই, বাংলাদেশের শিল্পী কামরুল হাসানের আঁকা একটি ছবির চমৎকার প্রিন্ট নিয়ে গিয়েছিলাম সে-দেশের সংস্কৃতি দপ্তরের জন্য উপহার হিসেবে। ভারতীয় কোনও জিনিস নিয়ে যাইনি। প্রিন্টটি আমি আমেরিকায় পেয়েছিলাম। ‘ভারতকে’ নিয়ে কোনও গান বাঁধিনি। আমার আবেগ এখানে নেই। বাংলাদেশকে নিয়ে পেরেছি আমার ভাষার আবেগের জন্যই শুধু নয়, বাংলদেশের মুক্তিযুদ্ধর জন্যেও, ‘ভাষা মতিনের’ জন্য, যিনি প্রবীণ বয়সে ১৯৯৬ সালে আমার একটি অনুষ্ঠানে এসেছিলেন । তাঁকে প্রণাম করে আমি যখন বললাম, “আপনি এতো কষ্ট করে এলেন?” – তিনি বলেছিলেন: “একজন ভাষা-সৈনিক আর-একজন ভাষা-সৈনিকের কাছে আসবে, সুমন। এটা প্রকৃতির নিয়ম।” এতো বড় সম্মান কেউ কোনওদিন দেননি আমায়: “ভাষাসৈনিক।” বাংলাদেশক্বে নিয়ে গান বাঁধতে পেরেছি সেই “ভাষা-মতিনের” জন্যও। খালাম্মার জন্য। বাংলাদশের সাধারণ মানুষদের কাছে যে ভালোবাসা পেয়েছি সেই জন্য। মোশররফ হোসেন নামে বাংলাদেশের এক প্রকৌশলীকে নিয়ে আমি একটি গান বেঁধেছি এই তো কিছুদিন আগে। আমার অনুরোধ রক্ষা করে বাংলাদেশেরই এক নাগরিক আমার গানটি ডাউণলোড করে একটি সি ডি বানিয়ে মোশাররফ হোসেনের হাতে তুলে দিয়ে এসেছেন। মোশাররফ হোসেন কোনওদিন আমার নামও শোনেননি। যিনি বা যাঁরা আমার অনুরোধ রক্ষা করেছেন তাঁদের জন্যেই গান বেঁধে এসেছি। তাঁরাই আমার বাংলাদেশ। বাংলাদেশকে আমি আমার ভেতরে ধারণ করে আছি। কে আমায় কী বলল তাতে আমার কিছু যায় আসে না। আমার ভালোবাসা নিন সকলে।

*******************************

কলম থাকলেই সুকুমার !!

এই কলকাতা শহরে তাসাপার্টির মিনি-নাকাড়ায় লয়কারির যে তুরীয় আস্ফালন এ জীবনে শুনে নিয়েছি, তা আমায় জীবনে ও সংগীতে বেপরোয়া হতে শিখিয়েছে। এই বেপরোয়াপনাকে ধারণ করে আছে কিন্তু যথেচ্ছাচার নয়। প্রতিভা, প্রশিক্ষণ, রেওয়াজ, অধ্যবসায়, সৃষ্টিশীলতা। তাসাপার্টির এই মিনি-নাকাড়াশিল্পী তালবাজনার সুকুমার রায়: ‘হাতি লোফেন যখন তখন’। ‘ষষ্ঠীচরণ’ হওয়া সবার কম্ম নয়। কলম থাকলেই সুকুমার, গিটার থাকলেই সুমন, আর তালবাজনা থাকলেই তাসার ওই জাত-বাউন্ডুুলে তালবাজ হওয়া যায় না।

*******************************

মহাজীবন !!

আজ আমি আর ঈশ্বর আল্লাহ মানি না, কাউকে মানি না। যে দুনিয়ায় বাংলাদেশের এক পথের পাশে ছোট্ট এক মেয়ে তার শূন্য বাম হাতের তালু থেকে ডান হাত দিয়ে শূন্যতা তুলে এনে মুখে পুরে দেয় সমানে, আর সে কি করছে এই প্রশ্ন করা হলে যে মেয়েটি বলে, ‘খিদা খাইতাসি’, সেই দুনিয়ায় ঈশ্বর নেই, কিচ্ছু নেই।

এই কথাটি প্রকাশ্যে বলার জন্য যদি কেউ আমাকে খুন করতে চান করতেই পারেন। এই ঘটনার পর আমি গত কয়েক মাস খেয়েছি, দু’ একবার ভালো দোকানে গিয়েও।

বিধাতা নেই, কিচ্ছু নেই, আছে শুধু ‘খিদা খাইতাসি’ !

এ মানব জীবনকে কোন আহাম্মক বলে ‘মহাজীবন’ ? কে বলে মানুষের উপর বিশ্বাস হারানো পাপ?


কৃতজ্ঞতাঃ-
ইশতিয়াক ইসলাম খান

*******************************

প্রিয় রুদ্রের প্রতি…

আমি ঈর্ষা করি, যত দিন না আমার দাফন হবে ,আমার ধারনা আমার দাফনের পর ও আমি রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহকে ঈর্ষা করব , খোদার কসম আমি রবীন্দ্রনাথকেও ঈর্ষা করি না, আমি ঈর্ষা করি লালন ফকিরকে, হাসন রাজাকে , কবি জসিমউদ্দিনকে, আর এই লোকটাকে যে দুটো লাইন লিখতে পেরেছিল,আর কাউকে আমি ঈর্ষা করিনা।
সেই দুটো লাইনঃ

ভালো আছি, ভালো থেকো,
আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখো।

*******************************

পেশা

বাবা বলতেন – গানটাকে পেশা করিস না, লোকে সম্মান করবে না। তার চেয়ে দিন চলে যাওয়ার মত কোন একটা চাকরি করবি আর নিজে গান গাইবি।

আশ্চর্য মানুষ ! নিজে নিজে ঘরে বসে গান গাইবে ছেলে, সেজন্য ছোটবেলা থেকে ছেলেকে একটানা গান শেখালেন। কত সঙ্গীত শিক্ষকের কাছে পাঠালেন। নিজে রবীন্দ্রসংগীত, হেমাংশু দত্তর গান শেখালেন। খেয়াল শেখার ব্যবস্থা করে দিলেন। আরও কত ধরনের গান। কৈশোর ও যৌবন চলে গেল গান শিখতে শিখতে। অথচ বাবা বলে বসলেন – গানটাকে পেশা করিস না, লোকে সম্মান করবে না !

*******************************

সশস্ত্র সংগ্রাম

সশস্ত্র সংগ্রাম জন্ম নেয় ক্ষুধা থেকে। বছরের পর বছর বঞ্চিত হতে হতে যখন দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যায়, তখনই সশস্ত্র সংগ্রাম জন্ম নেয়। জঙ্গলমহলের লোকজন সেই ১৯৪৭ সাল থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছে। তারা যদি সংগ্রাম না করে, তাহলে কে করবে?

২৯ জানুয়ারী, ২০১০ (কালের কণ্ঠ)

********************************

নাগরিকত্ব

প্রশ্নঃ শুনেছি,আপনি বাংলাদেশের নাগরিক হতে চেয়েছিলেন একবার?
কবীর সুমনঃ হ্যাঁ,আমি এখনো চাই। আমি সরকারের কাছে আবেদন করিনি,আমাকে রাস্তাগুলো বলে দিন,আমি করব। আমি একটি রাষ্ট্রে থাকি,সে রাষ্ট্রের প্রতি আমি শ্রদ্ধাশীল। আমি কিন্তু ভারতকে অশ্রদ্ধা করে বলছি না, কিন্তু আমার মুখের ভাষাকে সমানে আঞ্চলিক ভাষা বলা হবে,আমার সংস্কৃতিকে সমানে আঞ্চলিক বলা হবে-এটা আমি মানছি না। তেমনি উড়িয়া,অসমিয়া এসব ভাষাকে আঞ্চলিক বলা হবে-এ আমি মানছি না,মানবো না। আমি তো কলকাতার লোক। আমার নানাবাড়ি,দাদামশায়ের বাড়ি ছিল যশোরে। কিন্তু আমি কেন চাইছি জানেন?আমি ওখানেও সংখ্যালঘু,এখানেও সংখ্যালঘু। সংখ্যালঘু-সংখ্যালঘু কমন পড়ে গেল,কাটাকাটি হয়ে গেল। এখানে আসলে আমার ভাষা রাষ্ট্রীয় ভাষা হবে,এর বেশি চাওয়া আমার আর কিছু নেই।

{এটি ১৯৯৬ সালে সুমন বাংলাদেশে আসার পর ভোরের কাগজে দেয়া ইন্টারভিউর একটি অংশ}

*********************************

রবীন্দ্রনাথ…

আপনিই বলুন, শুধু স্বরলিপি হুবহু গেয়ে দিলেই কি আপনার গান হবে? স্বরলিপির সামান্য হেরফের হলেই কি সবকিছু বিফলে যাবে? পদস্খলনের ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে যদি ভাবটাই ফোটাতে না পারলাম, সেটা গান হবে কি করে?
আপনার গান কার গলায় মানায়, কার গলায় মানায় না, সেটাও অনেকে ঠিক করে বসে আছেন। আপনি যদি অলৌকিক কোন প্রক্রিয়ায় আমাদের মাঝে অন্য চেহারা আর নাম নিয়ে এখন এসে নিজের গান রেকর্ড করে যেতেন, কত লোক হয়ত আপনাকে শুনিয়ে দিত, “রবীন্দ্রসঙ্গীতটা আপনার গলায় ঠিক মানায় না”।
আপনার সব গান সারাক্ষণই যেন সবার ভালো লাগতে হবে। এরকম আইন যেন চালু। ট্যাঁ ফুঁ করলেই অমনি গায়ে “রবীন্দ্রবিরোধী’ ছাপ এটে দেবে।
আক্ষেপটা কি জানেন?
বুড়ো আপনার পছন্দের জিনিস নয়। কিন্তু সমস্যা হল, আপনার নাম এদেশে বুড়োরাই বেশি নেয়। সব কিছুর উপর তারা “দস্তুরের মই” চালিয়ে দেবে- এমনই বেরসিক।”

~রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে উদ্দেশ্য করে কবীর সুমন

**********************************

শেয়ার করুন: