জীবনের বেশিরভাগটা শেষ করে এনেছি। কত কী যে করে বেড়ালাম, করলাম। সাধ্যের চেয়ে সাধ বরাবরই বেশি। সেই সাধগুলো মেটাতে ছুটে বেড়িয়েছি, ওলটপালট করে দিয়েছি নিজের জীবনসমেত অনেককিছু।
আমার বয়স তখন ২৩। ব্যাংকে কেরানির চাকরি পেয়েছিলাম পরীক্ষা দিয়ে। এক সহকর্মী আমাকে নিয়ে গেলেন তাঁর বাসায় – বারুইপুরের দিকে। চা বিস্কুট খাচ্ছি। হঠাৎ বাড়ির অন্দরমহলে সোরগোল। বন্ধুটি বিব্রত। অন্দর থেকে কয়েকজন মহিলা বেরিয়ে এলেন গলবস্ত্র হয়ে। একজন ছুটে এসে আমার পায়ে পড়লেন। আমি চিৎকার করে দাঁড়িয়ে উঠেছি। ভদ্রমহিলা কাঁদতে কাঁদতে বললেন, “আমার শ্বশুরমশাই মারা যাচ্ছেন। আপনি ব্রাহ্মণ, আমাদের এই নিচু জাতের বাড়িতে পায়ের ধুলো দিয়েছেন। আপনি আমাদের বাঁচান। আমার শ্বশুর আপনার পায়ের ধুলো নেবেন, তবে তিনি শান্তিতে মরতে পারবেন।” – আমার বন্ধুটি প্রবল চেঁচামেচি জুড়ে দিলেন। আমি ফেললাম কেঁদে। কিছুক্ষণ ধরে চরম বিশৃংখলা চলল। চিৎকার চেঁচামেচিতে প্রতিবেশীরাও এসে জুটলেন। প্রায় সকলেই গলবস্ত্র হয়ে আমায় একই কথা বলতে লাগলেন: “আপনি ব্রাহ্মণসন্তান, ব্রাহ্মণ। আমরা ছোট জাত। চা জল খেলেন এই শুদ্রের বাসায়। আমাদের পাপ হবে যদি আপনি এই শেষ অবস্থার মানুষটিকে পায়ের ধুলো না দিয়ে চলে যান। দোহাই আপনার, আমাদের পাতকী করে রেখে যাবেন না।” – আমার যে কী হয়েছিল আমিই জানি। আমার বাবা ছিলেন এগ্নস্টিক। মা ঘোর নাস্তিক। ধর্ম, ঈশ্বর – এইসব কথা ছেলেবেলা থেকে শুনিনি।
পুজো মানি না বলে আমাদের বাড়ির ভিতপুজোর বিরুদ্ধে ছিলেন মা। সুভাষচন্দ্র সকলের আরাধ্য, তাই তাঁর জন্মদিন, ২৩ জ্যানুয়ারি, ১৯৭০, ভিত খোঁড়ার পরিকল্পনা ছিল। যে কামিন মানুষটি এসেছিলেন মাটি খুঁড়তে তিনি মাকে বললেন, “মা, আমি জাতে মুসলমান, কিন্তু ভিত পুজো না হলে আমার যন্ত্রে হাত দেবোনি।” হয়ে গেল। এদিকে ওদিকে ছোটাকছুটি করে এক পুরোহিত মশাইকে জোগাড় করে এনেছিলাম আমি। তিনি নমো নমো করে ভিত পুজো করেছিলেন। আমার মা আড়ালে গিয়ে গজগজ করছিলেন। বাবা, দার্শনিক, নীরবে চুরুটে টান। – এ-হেন “ব্রাহ্মণ” পরিবারের “ব্রাহ্মণ” সন্তান আমি। ২৪ বছর বয়সে অচেনা এক পরিবেশে আমার চেয়ে বয়সে বড় পুরুষ ও মহিলাদের চাপে পড়ে বাধ্য হয়েছিলাম চোখ বুজে দাঁড়িয়ে থাকতে – আর আমার বাবার চেয়েও বয়সে বড় এক বৃদ্ধকে অন্যরা ধরাধরি করে এনেছিলেন; বৃদ্ধটি তাঁর শীর্ণ দুই হাত দিয়ে আমার পা-দুটি জড়িয়ে ধরে ভেউ ভেউ করে কাঁদছিলেন, আমার পায়ে মাথা ঠেকাচ্ছিলেন আর বলছিলেন, “আপনি আমায় বাঁচালেন, আমি আপনার পায়ের ধুলো মাথায় নিয়ে এবারে মরতে পারব, এরাও বেঁচে যাবে – আমার ছেলেমেয়ে, বউমা, জামাই, নাতিনাতনি।” আমায় ঘিরে চাপা গলায় হরিধ্বনি দিচ্ছিলেন বাড়ির লোকজন। সেই মুহূর্তে আমি বুঝেছিলাম বাবাসাহেব আমবেদকার কেন বলেছিলেন, ” Hinduism is not a religion, it is a conspiracy.” আমি জীবনে প্রথম ঘৃণা করেছিলাম নিজেকে, আমার এই জন্মটাকে, আমার ভাগ্যকে। – আমার সেই বন্ধু আর আমি দুজনেই কাঁদতে কাঁদতে বেরিয়ে গিয়েছিলাম। তিনি আমায় সমানে বলছিলেন, “সুমনদা, আমি জানতাম না এমন হবে। প্লীজ ভাববেন না যে আমি কোনও প্ল্যান করে আপনাকে এনেছি। আমাদের বাড়িতে, পাড়ায় অনেকে রেডিয়োতে আপনার রবীন্দ্রসঙ্গীত শোনে, ভালবাসে। আপনি আর আমি এক অফিসে কাজ করি জেনে সবাই বলল আপনাকে একদিন আনতে আর বারুইপুরের মিষ্টি খাওয়াতে। –
আমি গর্বিত যে একদিন আমি আমার দেশের আইন মোতাবেক নিজের নাম পাল্টাতে পেরেছি। পাসপোর্টে লেখা – First Name: Kabir/ Surname: Suman আমার বাবামায়ের দেওয়া নামটাই আজ ১৪ বছর হয়ে গেল আমার “সারনেম।” এই নামেই আমার সব – ব্যাংক একাউন্ট, প্যান কার্ড, রেশন কার্ড, পাসপোর্ট। ধর্মান্তর ও আদালতে গিয়ে এফিডেভিট করতে যাওয়ার সময়ে মা’কে জানালাম নতুন নাম। তার আগে মা আর আমি জল্পনাকল্পনা করেছিলাম ‘সেলিম’ নামটা কেমন। মা আবার সি পি আই এম ভক্ত এবং আমি নকশাল (আমার মা’র ধারণা)। মা বলছিলেন, “সেলিম নামটি বেশ। মহম্মদ সেলিমকে আমার বেশ লাগে, কী চৌকস ছেলে, কী খাসা কথা বলে, আহা (সঙ্গে এক মুখ হাসি)।” – মহম্মদ সেলিমকে আমারও খারাপ লাগত না, কিন্তু সে-কারণে না, কবীর নামটি সুমন-এর সঙ্গে শুনতে বেশ লাগছে দেখে এই নামটাই বেছে নিয়েছিলাম। মা বার তিনেক নামটি বললেন, তারপর বললেন, “হুঁ! ঠিকই। বেশ লাগছে রে।” – মা সেই মুহূর্তে তাঁর প্রিয় ইংরিজি স্টেট্স্ম্যান পত্রিকা পড়ছিলেন। সেদিনের স্টেট্স্ম্যানের একটি খবর আমায় পড়তে বললেন মা। খবরটি হলো – বিশ্ব হিন্দু পরিষদ কোথায় যেন বেশ কয়েকজন আদিবাসীকে জোর করে হিন্দু বানিয়েছে। আমার মা, এককালের ডাকসাইটে সংস্কৃত স্কলার ও শিক্ষক পণ্ডিত রাজেন্দ্র বিদ্যাভূষণের মেয়ে, আমায় বললেন, “যা, তোর হিম্মত আছে। সব পাল্টে আয়। আমি তোর বাবার হয়েও তোকে আশীর্বাদ করছি। যেভাবে চাস জীবনটা বেঁচে নে।” – — আমার নানা/দাদামশাই পণ্ডিত রাজেন্দ্র বিদ্যাভূষণ (চোখে দেখিনি) স্যার আশুতোষের অনুরোধে তাঁর বিধবা মেয়ের বিয়েতে পৌরহিত্য করেছিলেন ব’লে তখনকার হিন্দু সমাজ তাঁকে সপরিবারে বয়কট করেছিলেন। যাকে বলে “ধোপা নাপিত বন্ধ”। অনেক হিন্দু ভদ্রলোক আর তাঁর কাঁকুলিয়া রোডের বাসায় আসতেন না, তাঁর আত্মিয়রাও না। এই সব গল্প আমার মা ও তাঁর বড় বোনদের কাছে শুনেছিলাম ছেলেবেলায়। –
আমি ‘সুমন চট্টোপাধ্যায়’ নামটি ছেড়ে কবীর সুমন হবার পর অনেকে আমার মা’কে ফোন করে বলা শুরু করলেন – “কী ম্যাডাম, আপনার ছেলে যে মোসলা হয়ে গেল – আপনারা হিন্দুদের মধ্যে কুলাঙ্গার।” মা-ই আমায় বলেছিলেন পরে। মা নাকি তাঁদের প্রত্যেককে ঠাণ্ডা গলায় বলতেন, “আমার ছেলে মুসলমান হবে না তো কী তোমার বাবা হবেন? সাহস থাকে তো আমার সামনে এসে কথা বলো।” কেউ আসেনি। ঠিক যেমন এই ফেসবুকে যারা আমার নামে কুৎসিৎতম কথা বলছে ও বলে যাবেই তারা কোনওদিন এই বুড়োর সামনে এসে তার মোকাবেলা করবে না। ঠিক যেমন “এককালে তো এই লোকটাই গান বেঁধেছিল – আমি চাই ধর্ম বলতে মানুষ বুঝবে মানুষ শুধু, এখন সে-ই কিনা বলছে সে মুসলমান, কবীর সুমন” – এই কথাটা বলার সময় কেউ যেমন ভেবে দেখেন না যে সেই সময়ে আমার নামের সঙ্গে ব্রাহ্মন্যধর্মের প্রতীকটি দিব্যি ছিল এবং সেই সময়ে কেউ এসে আমায় বলেননি বা কাগজে লেখেননি – “যান! এই গান গাওয়ার আগে নিজের নামের সঙ্গে ঐ চট্টোপাধ্যায় ব্যাপরটি ঘুচিয়ে আসুন। শালা হিন্দু বামুন, বড় গলা করে গাইছে ‘ধর্ম বলতে মানুষ বুঝবে মানুষ শুধু’।” – সেই দাবি কিন্তু কেউ করেননি কখনও। মজার কথা “কবীর সুমন” নামটি দেখে বা শুনে কিন্তু কারুর বোঝার কথা নয় এই লোকটার ‘রেলিজিয়ন’ কী। কবীর তো অমুশ্লীমদেরও নাম হয়। যেমন, এখনকার এক গায়ক কবীর চট্টোপাধ্যায়। “সুমন” কথাটির মধ্যেও তো ধর্মের গন্ধ নেই। অথচ দেখুন, লোকে কেমন মান করে খালিখালি। আহা রে!
২০০২ সালে একদিন এক হিন্দুবাদী সংগঠনের নাম করে (সম্ভবত বানানো নাম) একজন আমার মা’কে ফোন ক’রে জানান যে তার দুদিনের মধ্যে আমাদের বাড়িতে বোমা মারবেন সেই হিন্দুধর্মরক্ষকরা। আমার মা বলেছিলেন, “বোমা মারবে না ছাই। দেখি না কী করে।” কিন্তু আমিই একটু চিন্তিত হয়ে স্থানীয় থানায় ফোন করেছিলাম। দুজন অফিসার এসেছিলেন। বোমা পড়েনি। –
কত কী ঘটালাম এক জীবনে। লেখক হবার সাধ ছিল। কয়েকটা বইও লিখে ফেললাম। কাঁচকলা হলো। কেউ বলবে না – লোকটা লেখেও। – ১৪ বছর রাগসঙ্গীত এবং ৬/৭ বছর বয়স থেকে নানান ধরণের গান শিখিয়ে আমার বাবা একদিন আমায় বলেছিলেন, “তোকে যে এতো শেখালাম – তুই শিল্পী হবি বলে নয়, ভালো শ্রোতা হবি বলে। সঙ্গীতকে পেশা করিস না। লোকে তোকে বড্ড কষ্ট দেবে।” – আমার কমিউনিস্ট, নাস্তিক মা আমায় অমনি বলেছিলেন, “রেখে দে তোর বাবার কথা। গানবাজনা ছাড়বি না। এটা তোর ট্রেড। এটাই হবে তোর পেশা। কী শিখেছিস আর? ঐ একটু সারেগামা-টিমটিমটাই যা পারিস (এখানেও প্রফেট সুকুমার রায়)। ওটাই তোর ট্রেড।” –
লোকে আমায় বড্ড কষ্ট দেবে। ঠিকই। বেশিরভাগ লোক। কিন্তু অল্প কিছু মানুষ যে অকৃপণভাবে ভালোওবাসবে, বুকে টেনে নেবে – এটা আমার বাবা আমায় বলেননি। মৃত্যুর আগে (তাঁর শেষ সেরিব্রাল এটাক হবার কয়েকদিন আগে) তিনি আমায় একদিন কাছে ডেকে, আমার কাছ থেকে একটা সিগারেট চেয়ে নিয়ে, ধরিয়ে, চোখ বুজে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বলেছিলেন, “আমি এবারে যাবো। তুই কেটে পড়ার আগে দুটো কাজ করে যাবি। তোকে আমরা যেভাবে শেখাতে পেরেছি সেইভাবে রবীন্দ্রনাথের কিছু গান তুই রেকর্ড করবি। আর, সমান জরুরি – মরার আগে তুই তোর ভাষায়, তোর বাংলায় কিছু খেয়াল গেয়ে যাবি। বাংলা খেয়াল অতীতে যে বাংলায় লেখা হয়েছিল সেই ভাষায় নয়। যেভাষায় তুই আধুনিক গান লিখেছিস সেই ভাষায়, সেই বাংলা ভাষায়।” – আমার সামনে আজ এটাই বড় কাজ। শেষ কাজ। বাংলায় খেয়াল গাওয়া। কারুর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে নয়। সকলেই আমার চেয়ে ভাল, অনেক ভাল। ভাল তালিম দীর্ঘকাল পেলেও আমি তো সারা জীবন খেয়াল চর্চা করিনি। কিন্তু মোটামুটি গাইতে পারি। সেইভাবেই। – ঠিক এইভাবে অনেক বছর আগে একদিন আমি ঠিক করেছিলাম
– বাংলা আধুনিক গান যদি গাইতে হয় তো নিজেকেই লিখতে, সুর করতে হবে। গুরুরা আমায় আশীর্বাদ করুন। তাঁরা এখন যে লোকে আছেন সেখান থেকে।





























