বাংলা গানের দিকপাল শিল্পী কবীর সুমন বলেছেন, শাহবাগের আন্দোলন দেখে অনেক দিন পর তাঁর লেখার বড় ইচ্ছা জেগে উঠেছে। শাহবাগের তারুণ্য তাঁকে বাঁচতে সাহায্য করছে। তিনি বলেন, ‘একটি আন্দোলনকে কিভাবে এ রকম গণতান্ত্রিক ও সর্বজনীন করা যায়, সেটি বাংলাদেশের এই প্রজন্ম দেখিয়ে দিলেন। আমি তাঁদের স্যালুট জানাই।’ দক্ষিণ চবি্বশ পরগনার বাড়িতে বসে কালের কণ্ঠকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সুমন শাহবাগের আন্দোলন নিয়ে তাঁর উজ্জীবিত হয়ে ওঠার অনুভূতি জানানোর পাশাপাশি এ নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের মিডিয়ার কার্পণ্য ও মানুষের নীরবতায় হতাশা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘কোথাও যেন আমরা (পশ্চিমবঙ্গবাসী) নেতিয়ে যাওয়া মুড়ির মতো হয়ে পড়েছি।’ সুমন তাঁর মনের গভীরের ইচ্ছাটিও ব্যক্ত করেন এক ফাঁকে, ‘মৃত্যুর আগে আমি বাংলাদেশের নাগরিক হতে চাই।’
গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে দক্ষিণ চবি্বশ পরগনার নাগতলা স্টেশনের লাগোয়া পূর্ব-বৈষ্ণবঘাটা লেকের বাড়িতে কালের কণ্ঠের সঙ্গে কথা বলেন সুমন। শাহবাগের আলোর ছটায় তিনি এখন প্রতিদিনই গান লিখছেন। আজও একটি গান লিখেছেন। জীবনমুখী গানের স্রষ্টা সুমন পর পর দুটি গান লিখে শাহবাগের প্রজন্ম চত্বরের সৈনিকদের সহযোদ্ধা হয়েছেন। তাঁর গান বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের এই আন্দোলনে এখন শক্তি জোগাচ্ছে, কালের কণ্ঠের প্রতিবেদকের মুখে এই কথা শুনে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন ষাটোর্ধ্ব সুমন। তিনি বলেন, ‘আমার মানবজনম, শিল্পীজনম সার্থক। বহুদিন ধরে গান করছি। যদি আমার গান কোনো কাজেই না লাগল, তবে কেন করছি। এবার মনে হচ্ছে, আমার শিল্পীজনম সার্থক হলো।’
ঠিক কোন প্রেক্ষাপটে, কী ভেবে শাহবাগের আন্দোলন নিয়ে গান লিখলেন- এই প্রশ্নের উত্তরে শিল্পী সুমন বললেন, ‘বাংলাদেশের সঙ্গে আমার একটা নাড়ির যোগ আছে। একাত্তরে আমার যখন ২২ বছর, তখন আমি ও আমার দাদা আনন্দরূপ ঠিক করেছিলাম, দুজনই বাংলাদেশের নাগরিকত্ব নেব। সেটা হয়ে ওঠেনি নানা কারণে। কিন্তু এর জন্য আমার কোনো দুঃখ নেই। মনে মনে আমি তো বাংলাদেশের নাগরিকই রয়েছি। যখন তরুণদের আন্দোলনের কথা শুনলাম, তখনই মনে হলো, অনেক দিন পরে লেখার জায়গা পেলাম।’
যুদ্ধাপরাধের বিচার দাবিতে ঢাকার শাহবাগে রাত-দিন পাশাপাশি বসে তরুণ-তরুণীরা যেভাবে সোচ্চার হচ্ছে, তাতে সুমন বিস্মিত। তিনি এ আন্দোলনকে ‘উপমহাদেশের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার’ স্পষ্ট ইঙ্গিত বলে মনে করেন। এর মানে আপনি বলতে চাইছেন এই উপমহাদেশে গণতন্ত্র নেই- কালের কণ্ঠের প্রতিবেদকের প্রশ্নের উত্তরে সুমন যেন গর্জে উঠলেন। বললেন, ‘ছিল না। বিশ্বের আর কোথায় গণতন্ত্র আছে না আছে, সেটা আমার আগ্রহ নেই। কিন্তু উপমহাদেশে গণতন্ত্র ছিল না। এই আন্দোলন দেখে আমার মনে হয়, উপমহাদেশে গণতন্ত্র আসছে। নবীনরাই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘শাহবাগের তরুণদের মুখের হাসি, তাদের উত্তোলিত হাতের মুষ্টি, বুকের উত্তেজনা আমাকে বাঁচতে সাহায্য করছে।’
পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান পরিবেশে সুমনের অসুখী মানসিকতাও উঠে এলো তাঁর কথায়। বললেন, ‘আমার পরিবেশ আমায় মারতে চেষ্টা করছে। মুনাফাবাজি, ধান্দাবাজি, লোক ঠকানোর কারবার আমায় মেরে ফেলতে চায়। আমার ভেতরের মানবসত্তা ও শিল্পীসত্তাকেও। আজ অনেক দিন পর একটা ঘটনা (শাহবাগ) দেখলাম, যেটা দেখে মনে হলো আমাকে গান তৈরি করতে হবে। পারলে রোজ গান তৈরি করব। আজও করব।’
আপনি শাহবাগ কিংবা কলকাতায় আজ দুপুরে বাংলাদেশ উপহাইকমিশনের সামনে বাংলাদেশি ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলনে শরিক হবেন কি না- এ প্রশ্নে সাফ ‘না’ জবাব দিলেন সুমন। কেন ‘না’ সেটিও তিনি বললেন। তাঁর বক্তব্য, ‘আমার গান যেখানে আছে, সেখানে আমি ব্যক্তি সুমন কী? আর ওই গান এখন আর আমার না, আমাদের।’
শাহবাগের প্রজন্ম চত্বরের গণজাগরণের খবর যেভাবে বাংলাদেশের মিডিয়ায় প্রচারিত হচ্ছে, তার ছিটেফোঁটাও কলকাতার মিডিয়াতে নেই বলে আক্ষেপ করেন কবীর সুমন। তিনি বললেন, ‘আমি বাংলাদেশের আরো একটি দৈনিক পত্রিকায় টেলিফোনে ইন্টারভিউ দিয়েছি। ওরা একটি বারের জন্য এই গানের ইস্যু ছাড়া আমায় অন্য কোনো প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করেনি। এতেই বোঝা যায়, বাংলাদেশের মিডিয়া কতটা এগিয়ে কাজ করছে। আর আমাদের এখানে (কলকাতায়) একটা কথা বলার উপায় নেই। সঙ্গে সঙ্গে তার অন্যান্য পরিচিত এসে পড়বে। আমি সংগীতকার হিসেবে গান-বাজনা করছি। অন্যকিছু হিসেবে না। কিন্তু এখানে এসব নিয়েও অনেক কিছু খোঁজার চেষ্টা হয়। কিন্তু বাংলাদেশের মিডিয়া এবং কেউ এখনো অন্য কোনো প্রশ্ন করেনি। সেই সম্মানটা আমায় দিচ্ছে। শিল্পীর সম্মান। এটা আমি বাংলাদেশেই পেলাম। এটা ভেবে আমার আরেকবার মনে হচ্ছে, মরার আগে নাগরিকত্বটা নেবার একটা শেষ চেষ্টা করব।’
তবে কবীর সুমানের কষ্ট, এই আন্দোলনের পশ্চিমবঙ্গের সুশীল সমাজের কেউ এখনো একাত্মতা প্রকাশ করেনি। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ সম্পর্কে পশ্চিমবঙ্গের আমরা আসলে ভণ্ড। যেমন বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন নিয়ে পশ্চিমবঙ্গে একটি টু-শব্দও শোনা যায়নি। এমন কী আমার শিক্ষক, বাবা-মাও আমাকে কিংবা আমাদের কিছু বলেননি। একাত্তরের পর আমরা বায়ান্ন নিয়ে চিন্তা করলাম। মুখে বলি, এপার বাংলা-ওপার বাংলা। কজন খোঁজ রাখি বলুন তো। আজ আমি একা কেন এই আন্দোলনে এখানে। তারুণ্যের এই উল্লাস, এই সেলিব্রেশনে এপার বাংলার মানুষদের আশা উচিত। কিন্তু সেটা হবার নয়। কোথাও যেন আমরা নেতিয়ে যাওয়া মুড়ির মতো হয়ে পড়েছি।’
সৌজন্যেঃ-
কালের কণ্ঠ (১৩ই ফেব্রুয়ারী, ২০১৩)





























