Search
Close this search box.

খেয়াল

বাংলা ভাষায় খেয়াল গানের প্রসঙ্গে…

বাংলা ভাষায় খেয়াল গানের জন্য কবীর সুমন বাংলা ভাষায় খেয়াল পরিবেশন করার পক্ষে সওয়াল করেছেন।

তিনি জানিয়েছেন, ‘আমি শুনেছি, অল ইন্ডিয়া রেডিও বাংলা ভাষার খেয়ালকে স্বীকার করেননি বলে আচার্য তারাপদ চক্রবর্তী একটি বড়রাষ্ট্রীয় পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেন। …আমি তো রাগের একটা রূপ প্রতিষ্ঠা করছি, বিস্তার করছি, রাস্তা খুঁজছি। তাতে ভাষাতে কী আসে যায় ! ভাষা যদি না -ই থাকে শুধু সরগম তাতে ঠেকাচ্ছে কে?’ সংগীতাচার্য তারাপদ চক্রবর্তী ছাড়াও বাংলা ভাষায় খেয়াল পরিবেশন করার জন্য অল ইন্ডিয়া রেডিও -র সঙ্গে আরও একজন সংগীত গুণীর চরম সংঘাত হয়েছিল। বিষ্ণুপুর ঘরানারসেই সংগীতজ্ঞ গুণীর নাম সত্যকিঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়। আচার্য গোপেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভ্রাতুষ্পুত্র।

ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশনের (তখনও আকাশবাণী নাম হয়নি )প্রথম বেতার অনুষ্ঠানটি করেন আচার্য সত্যকিঙ্করবন্দ্যোপাধ্যায়। তার পর থেকে নিয়মিত শিল্পী হিসেবে ধ্রুপদধামার খেয়াল -সহ সেতার বাদন পরিবেশন করতে থাকেন। ১৯৬২ সালের মার্চ মাসে বিকেলের অনুষ্ঠানে বাংলা ভাষায় মূলতান রাগে খেয়াল পরিবেশন নিয়ে আকাশবাণী বা অলইন্ডিয়া রেডিও -র কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তাঁর চরম সংঘাত বাধে। সত্যকিঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর আত্মজীবনীমূলক রচনা ‘সুরের পথে একটি জীবনে’ লিখেছেন, “বেশ কিছু দিন ধরেই আমি মনে করছিলাম শাস্ত্রীয় সংগীতের শ্রেণিগত গান নিজেদের মাতৃভাষায় গাওয়ার একান্ত প্রয়োজন আছে। এর দ্বারা সাধারণ শ্রোতাদের ভাষার ভাব বুঝতে পেরে এই সব গানে তাদের মনকে আকৃষ্ট করবে এবং ক্রমশ শোনার আগ্রহ ও অনুরাগ বাড়বে। “তারপর বাংলা খেয়াল গাওয়ার ব্যাপারে আমার সঙ্গে বেতার কর্তৃপক্ষের যে কাণ্ড ঘটে গেল, কর্তব্য ও আদশের্র উপর সংঘর্ষ বেধেছে খবর জানতে পেরে ‘আনন্দবাজার’ ও‘যুগান্তর’ পত্রিকার প্রতিনিধিরা এসে আমার কাছ থেকে চিঠিপত্রের আদানপ্রদান ও কাগজপত্র সমস্ত নিয়ে গিয়ে তাঁদের পত্রিকায় আমার পক্ষ অবলম্বন করে প্রচণ্ড ভাবে লেখালেখি আরম্ভ করলেন বেতার কর্তৃপক্ষের অযৌক্তিক ব্যবহারের বিরুদ্ধে। “আনন্দবাজার পত্রিকার ‘তির্যকে’ আমার চেহারাটাকে ধরে বাঁহাতটার আগাগোড়া ব্যান্ডেজ বেঁধে দিয়ে গলায় ঝুলিয়ে রেখে এবং মাথার উপর মারের চোটে বলের মতো ফুলিয়ে রাস্তায় দাঁড় করিয়ে পথিকের প্রশ্নের উত্তরে লেখা ছিল ‘বাংলা খেয়াল গাইব বলেছিলাম তাই …।’ পশ্চাতের দোতলা বারান্দায় একটিকোট -প্যান্ট পরা সভ্যমূর্তি এঁকে তার হাতে মস্ত এক লাঠি উঁচিয়ে ধরা অবস্থায় ছিল এবং সেই দোতলা বাড়ির মাথায় লিখে দেওয়া হয়েছিল‘আকাশবাণী’।” সহজে দমবার পাত্র ছিলেন না প্রখর আত্মমর্যাদাবোধ সম্পন্ন মানুষটি। কলকাতা হাইকোর্টে মামলা করেছিলেন বাংলা ভাষায় খেয়াল পরিবেশনের অধিকার আদায়ের জন্য। মাতৃভাষায় খেয়াল পরিবেশনের দাবিতে রেডিও কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে সেই মামলার রায় সংগীতাচার্যের পক্ষে যায়নি। এটিবড় কথা নয়। বিচার্য হল তাঁর চিন্তার প্রাসঙ্গিকতা। ভারতের সংগীত ইতিহাসে এই ঘটনাটি সম্ভবত এখনও অদ্বিতীয়। খেয়াল গানে ভাষা প্রসঙ্গে আরও একটা কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন। গ্বালিয়রের ঘরানার অনেক বন্দিশ পঞ্জাবি ভাষায় রচিত, যা এখনও ওই ঘরানার গুণীরা গেয়ে থাকেন। সদারঙ্গবা নিয়ামত খানেরও পঞ্জাবি ভাষায় রচিত বন্দিশ আছে। টপ্পারজনক শোরি মিঞার ভাষাও তো পঞ্জাবি।


সৌজন্যেঃ-
এই সময় (৩ নভেম্বর, ২০১৩)
জয়দীপ মুখোপাধ্যায়। অরবিন্দনগর, বাঁকুড়া।
তথ্যঃ
উৎসব রায়।

শেয়ার করুন: