মাননীয় বন্ধুরা, কমরেডরা, শত্রুরা
এক সময়ে বড্ড বেশি বাইরের নানান কাজে ঝাঁপিয়ে পড়তাম। নানান ডাকে সাড়া দিতাম। জড়িয়ে পড়তাম বিভিন্ন ব্যাপারে। ২০০৬ সালে বিপুল এক আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ার পর অনেক কিছু ঘটেছে। ২০১১ সালে এই রাজ্যে সরকার পাল্টে গিয়েছে। সিঙুর নন্দীগ্রাম লালগড়ের জনজাগরণের পরিনামেই ধাক্কা খেয়েছে ৩৪ বছরের বিশাল জগদ্দল পাথরটা। এককালে বামপন্থীদের কাছে পশ্চিমবঙ্গের জনগণের যেমন অনেক আশা ছিল তেমনি ২০০৬ সাল থেকে ক্রমান্বয়ে ঘনীভূত হওয়া ও গতিবেগ পাওয়া গণ-আন্দোলনের হাওয়া যখন ঝড়ের রূপ নিতে থাকল, ২০০৯ সালে যখন তৃণমূল দল অনেকগুলি আসন পেলেন (এস ইউ সি-ও একটি – নির্দল হিসেবে) সাধারণ মানুষের মনে তখন বড় মাপের আশার সঞ্চার হয়েছিল – পরিবর্তন আসছে, সাধারণ মানুষের ভাল হবে। শহীদদের (সকলেই গ্রামবাংলার মানুষ) আত্মাহুতির নিশান উড়িয়ে, তাপসী মালিকের নাম ইষ্টনামের মতো জপ করতে করতে, সি পি এম হার্মাদদের কবলে ধর্ষিতাদের কথা বলতে বলতে (সকলেই, আবার, গ্রামবাংলার মানুষ) আমরা ২০০৯ -এর ভোটে জিতেছিলাম। বিরোধী নেতা হিসেবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দীর্ঘ সংগ্রামের ভূমিকা অবশ্যই ছিল। কিন্তু সিঙুর নন্দীগ্রাম লালগড় না হলে, সি পি এম সরকার কৃষিজমি দখলের দিকে না গেলে সরকার-বদল যে কিছুতেই সম্ভব হতো না তা যে-কোনও যুক্তিবাদী মানুষ মানবেন। কিন্তু ২০১১ সালে বিধানসভার ভোটে বামপন্থীরা শোচনীয়ভাবে হেরে যাওয়ায় অনেকের মনে শুভ পরিবর্তনের যে আশা জেগেছিল, খুব তাড়াতাড়িই দেখা যেতে লাগল যে সে-গুড়ে বালি। সি পি আই এম শাসনের শেষ কিছু বছরে অপশাসনের যে নমুনাগুলি সকলেই দেখছিলেন (এমনকি সি পি আই এম দলের বিবেকী মানুষরাও হয়তো) জনগণ ভেবেছিলেন সেগুলি অতীতের বিষয় হয়ে গিয়েছে। কিন্তু না। সে-আশা থাকতে দিলেন না এই রাজ্যের নতুন সরকার, নতুন মুখ্যমন্ত্রী। আবার সেই ঔদ্ধত্য, আবার সেই স্বৈরাচারীসুলভ হাবভাব কথাবর্তা পরমত-অসহিষ্ণুতা, আবার সেই শাসকদলের বাহুবলীদের প্রতাপ, আবার সেই পুলুশি জুলুম, আবার সেই সত্যের অপলাপ – একের পর এক। – ব্যক্তিগতভাবে আমি ২০০৯ সাল থেকেই অনেক বিষয়ে বিরোধিতা করে এসেছি মমতা বন্দ্যোপধ্যায়ের। অনেক ঘটনা নিয়ে রাজনৈতিক গান বেঁধেছি। সেগুলি এখানকার একাধিক টিভি চ্যানেল প্রচারও করেছেন। সত্যি বলতে আমার নিজেরই একঘেয়ে লাগছিল। আর কতো রাজনৈতিক গান বানাবো। – আমার শরীরও ভেঙে গিয়েছে। দেহে নানান উপসর্গ। শত্রুদের মুখে চপ কাটলেট নিক্ষেপ করে আমার আর্থরাইটিসের ব্যথাও ধরেছে। একটানা হাঁটতে বড্ড কষ্ট। মায়ের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া। নিজেকে গৃহবন্দী করে রাগসঙ্গীত চর্চায় ও রেয়াজে মন দিয়েছি পুরোপুরি। আর কোনও আন্দোলনে নেই। শরীর মন আর নেয় না। আর মিটিং মিছিল পারব না। ওটা আমার কাজও নয়। জীবন-সায়াহ্ন। আর ক’বছর বাঁচব? কর্মক্ষমতা আর ক’বছর থাকবে? সামনের সময়টা আর যে-কাজ-আমার-নয় সেই কাজে নষ্ট করতে চাই না। কিন্তু চারদিকে যা ঘটে চলেছে, আরও অনেকের মতো বড় অস্বস্তিতে আছি। কী করব জানি না। একের পর এক ধর্ষণ, খুন। সৌরভ নামে এক তরুণকে কীভাবে মারল! তাঁর শরীরটা কেটে কেটে নানান জায়গায় রেখে দিল! তার আগে এক সাংসদ ভয়ানক সব কথা বলে আইনের কবল থেকে কেমন রেহাই পেয়ে গেলেন। অনেকেই প্রতিবাদ করলেন, করছেন। এবারে সৌরভের বেলা আমরা কী করব? আবার মিছিল? মিটিং? কী হবে! আবার সেই চেনা কিছু মুখ। আবার সেই কথা কথা কথা। এক বিহারী ট্যাক্সিচালকের মেয়েকে কিভাবে ধর্ষন ক’রে পুড়িয়ে মারল। তারপর পুলিশ শ্মশানে শ্মশানে ঘুরে বেড়ালেন – ডেথ সার্টিফিকেট ছাড়াই শবদাহ করার লক্ষ্যে। এটাও সম্ভব হলো। একটি ধর্ষন, গণ-ধর্ষণের মামলাও এগোলো কি? সৌরভের খুনীরা এখনও ধরা পড়েনি। পুলিশ সুমন মুখোপাধ্যায়কে জেরা করতে ব্যস্ত। এর পর প্রশাসনের নজর কার দিকে যাবে? এবারে কে বা কে কে জেরার মুখে পড়বেন? – সেই বিহারী ট্যাক্সিচালক রবীন্দ্র-নজরুল-বিবেকানন্দ-শ্রীরামকৃষ্ণ-মাসারদার রাজ্য ছেড়ে পালিয়ে বেঁচেছেন। শুনেছি বিহার সরকার তাঁকে চাকরি দিয়েছেন। আমাদের রাজ্যটাকে, আমাদের তিনি ও তাঁর স্ত্রী কিভাবে মনে রাখবেন? গ্রাহাম স্টুয়ার্ট স্টাইনসের স্ত্রী যে-দেশে তাঁর স্বামী ও ছেলেরা ধর্মান্ধদের হাতে পুড়ে মারা গিয়েছিলেন সেই দেশ ছেড়ে ফিরে গেছেন তাঁর দেশ অস্ট্রেলিয়ায়। তাঁর কাছে ক্ষমা চাওয়ার সুযোগও পাইনি আমরা। এই বিহারী ট্যাক্সিচালক ও তাঁর স্ত্রীর কাছেও ক্ষমা চাইতে পারিনি আমরা। তাপস পাল মহোদয় কি-সুন্দর ক্ষমা চেয়ে নিলেন তাঁর নেতার কাছে। আর কী? এবারে “যাও সবে নিজ নিজ কাজে।” – সৌরভের বাবা-মা-দাদাকে আমরা কী বলব? তাঁর খুনীদের নিয়ে আমরা কী করব? নিজেদের নিয়ে আমরা কী করব? কী করব নিজেকে নিয়ে আমি? জার্মান সংরাইটার-কবি হ্বল্ফ্ বিয়ারমানের একটি কবিতার কিছু লাইন মনে পড়ছে: “এই ছিন্নভিন্ন দেশে আমাদের স্বপ্নগুলোর কী হবে?/ কী হবে আমাদের বন্ধুদের?/ কী হবে তোমার? কী হবে আমার?/ এখান থেকে চলে যেতে চাই সবচেয়ে বেশি/ থেকেও যেতে চাই এখানেই সবচেয়ে বেশি।” – আমার ক্ষমতা নেই যে সৌরভের খুনিদের ধরে ওরা যা যা করেছে তা ওদেরই ফেরত দিই। কোনও কাজের কাজ করার ক্ষমতাই নেই। আমার মন বলছে, আরও অনেকের আজ আমার মতোই দশা। তাই লিখলাম এসব, যদিও জানি কাজের কাজ কিছুই হবে না এতে।
০৭-০৭-১৪





























