
ফেসবুকে দেখলাম আজ আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের জন্মদিন। মন চলে গেল ১৯৯৫ সালে। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস তখন বিখ্যাত ক্যান্সার-চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞ ডাক্তার স্থবির দাশগুপ্তর চিকিৎসায়। রোগটা এমন জায়গায় চলে গিয়েছে যে তাঁর একটি পা কেটে বাদ দিতেই হবে। দক্ষিণ কলকাতার একটি নার্সিং হোমে সার্জারি হতে চলেছে, আমি দেখা করতে গেলাম। তাঁর স্ত্রী জানালেন ইলিয়াসদা বাইরে একটু হাঁটাহাঁটি করছেন। ফিরে এসেই এক গাল হেসে তিনি বললেন, এই দুই পায়ের ওপর ভর করেই সারা বাংলাদেশ চষে ফেলেছি এক সময়ে। দুটির একটি কাল চলে যাবে। তাই শেষবারের মতো নিজের পায়ে একটু হেঁটে নিলাম। – হালকা চালে কথা বলতে শুরু করলেন। বিষয় – আমার গান। আমি ভাবতেও পারিনি আখতারুজ্জামান ইলিয়াস আমার গানগুলো অতো খুঁটিয়ে শুনেছেন। কলকাতা বা পশ্চিমবঙ্গের কোনও লেখক এভাবে আমার সঙ্গে কথা বলেননি কখনও। পরিচয় হয়েছে অনেকের সাথেই। অনেকের মধ্যেই ভাব দেখতাম যেন আমি অন্য যে-কোনও “গায়কের” মতো। সংগীতের লোকদের সহিত্যিক, নাট্যকার, চলচ্চিত্র পরিচালকরা (এই দেশে অন্তত) একটু করুণার চোখে দেখেন। আমি যে গান সৃষ্টি করে চলেছি তার কোনও খবর তাঁরা কেউ (একমাত্র ব্যতিক্রম ছিলেন কবি অরুণ মিত্র) রাখেন বলে মনে হয়নি। আখতারুজামান ইলিয়াস আমার গানের পর গান ধরে ধরে কোথায় কী লিখেছি, বাক্যগুলো কেমন, কোন্ শব্দ বা শব্দসমষ্টি তাঁকে ভাবিয়ে তুলেছে – কথা বলে যেতে লাগলেন। আমি শ্রোতা। “চিলে কোঠার সেপাই”-এর স্রষ্টার সামনে চুপ করে বসে থাকা ছাড়া আর কীই বা করার থাকতে পারে আমার মতো লোকের। বিদায় নেওয়ার আগে তাঁকে বলেছিলাম, ইলিয়াসদা, শুনেছি কেটে বাদ দেওয়া পা-টা নাকি পরে চুলকোয়। ‘গোস্ট লিম্ব’। – হাসতে হাসতে খিজিরের স্রষ্টা বললেন, কাল কাটা পড়বে, পরশু তো আসছেন, ততক্ষণে টের পেয়ে যাব, জানাব আপনাকে।
দু’দিন পর দেখতে গেলাম তাঁকে। হাসি হাসি মুখে শুয়ে আছেন। বুক থেকে পায়ের তলা অবধি পুরু চাদর ঢাকা। তাঁর স্ত্রী একটু দূরে চেয়ারে বসে। তাঁর চিকিৎসক, আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু স্থবির হাজির। আমায় দেখেই ইলিয়াসদা সোৎসাহে বলে উঠলেন, সুমন, চুলকেছিল! কী-চুলকোনই না চুলকোচ্ছিল পা-টা, অথচ ওটা তো কেটে বাদ দিয়ে দিয়েছেন স্থবির। – এইরকমের এক ব্যাপার, কিন্তু বক্তার বর্ণনার ভঙ্গিতে আর তাঁর মুখচোখের ভাব দেখে আমরা সকলেই হাসছি – ইলিয়াসদার স্ত্রীও।
১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরের জন্য টাকা তুলতে বাংলাদেশ গিয়েছি। কয়েকদিনমাত্র থাকব। তারই মধ্যে ঠিক করে নিয়েছি আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের সঙ্গে দেখা করবোই। বাংলাদেশের এক গ্রন্থ প্রকাশক আমায় নিয়ে গেলেন তাঁর বাড়িতে রিক্সা করে। ইলিয়াসদা খোসমেজাজে। আমায় দেখেই উঠে দাঁড়ালেন তাঁর একটি পায়ে ভর করেই। আমার কোনও আপত্তিই শুনলেন না। বয়সের ভারে শরীরও তখন ভারি। ক্যান্সার ততদিনে আরও ছড়িয়ে পড়েছে। তাও শরীর ও মনের সমস্ত শক্তি দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। খোয়াবনামার স্রষ্টা। আমায় বুকে জড়িয়ে ধরে স্বভাবসিদ্ধ মজা করেই বললেন, সুমন, বাংলাদেশে এসে আপনি ‘অমুক’ লোক পরিবৃত হয়ে আছেন শুনলাম। আমাদের কপাল, আপনারও কপাল। – ‘অমুক’-এর জায়গায় যে শব্দটি উনি বলেছিলেন সেটি লিখলাম না। – হেঁটে চলা ফেরা করার অবস্থায় থাকলে আপনাকে নিয়ে একটু ঘুরে বেড়াতাম আমাদের দেশে। – নানান কথা হলো। বিদায় নেওয়ার সময়ে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস বললেন, সুমন, আপনার গানের একটি লাইন কি আমরা দেখে যেতে পারব না? ‘মরব দেখে বিশ্বজুড়ে যৌথ খামার’। – মরার আগে দেখে যেতে পারব না, সুমন? – কেন যে মরতে লিখেছিলাম ওরকম গান। আমায় যাঁরা বাংলাদেশে নিয়ে গিয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে বড়জোর দু’জন আমার গানের সঙ্গে সত্যিই পরিচিত ছিলেন। এখন আমি যাঁর সামনে, তিনি আমার গানগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে শুনেছেন। এতোটা না শুনলেই হয়ত ভাল হতো। বিহ্বল দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, যাঁর সমতুল্য কাহিনীকার মানবেতিহাসে বিরল। বিদায় দিতে গিয়ে আবার মরিয়া হয়ে উঠে দাঁড়াতে চেষ্টা করলেন তাঁর হুইল চেয়ার থেকে। আমি ছুটে গিয়ে তাঁকে ধরলাম। এবারে তিনি নিজেই দাঁড়িয়ে। এক পায়ে। ডান হাতটা কপালে ঠেকিয়ে তিনি বললেন, আদাব।
আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের সঙ্গে আমার আর দেখা হয়নি। কিন্তু আমি জানি অদ্ভূত এক ‘অন্য গানের ভোরে’ বা বিকেলের প’ড়ে আসা আলোয় আমাদের আবার দেখা হবেই। একটু সবুর করুন, ইলিয়াসদা। এই এসে পড়লাম বলে আপনার কাছে।
১৩ই ফেব্রুয়ারী, ২০১৪





























