ভীষণ সুচিন্তিত নয়। ভাবতে ভাবতে লেখা – আজকাল-এ শ্রী অলোকপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের রিভিউ পড়ে। আমার কথাই ঠিক এমন কোনও দাবি আমার নেই। পরে এই বিষয়ে আমি আরও গুছিয়ে লিখব হয়তো।
আজকাল-এ অলোকপ্রসাদের রিভিউটি ভাল লাগল। বিশেষ ক’রে এই কারণে যে তিনি রিভিউ লিখতে গিয়ে কোনও আল্গা স্মার্টনেস দেখাননি, চালিয়াতি করেননি। ছবিটি তিনি মন দিয়ে দেখেছেন, মন থেকে লিখেছেন ছবিটি নিয়ে। তাঁকে নমস্কার জানিয়ে আমি দু’একটি কথা বলতে চাই। এই ছবিতে সৃজিত বাংলা গানের ধারাকে তুলে ধরতে চেয়েছেন বলে আমার মনে হয় না। তা যদি চাইতেন তাহ’লে কবিয়ালদের যুগের পর ১৯ শতকে আধুনিক গানের যে বিবর্তন শুরু হলো তারও একটা ছোট হলেও রূপরেখা থাকত তাঁর ছবিতে। বৈঠকী গানও বাদ যেতে পারত না। তেমনি বাংলার পল্লীগীতির নানান দিক থাকত। লালনের ঐ গানটি বাংলার পল্লীগীতির অতি ক্ষুদ্র একটি অংশমাত্র। বাংলা গানের বিবর্তনধারা নিয়ে কাহিনী চিত্র করলে তার ন্যুনতম দৈর্ঘ যা হবে তা এতটাই যে ছবির একটি সিরিজ বানানো দরকার হয়ে পড়বে। সেই সিরিজ চলবে টানা কয়েক সপ্তাহ ধরে। না, সৃজিত সেরকম কিছু করতে চাননি। কবিয়ালদের ১৩টি গানের লিরিক (অতীতে “বাণী” বলা হতো) বেছে নিয়ে আমাকে দিয়ে সেগুলিতে সুরারোপ করিয়েছেন। এই কাজটি করতে গিয়ে আমাকে নানান সঙ্গীতরূপের শরণ নিতে হয়েছে, যেখানে এক রত্তিও পাশ্চাত্য সংগীত নেই। এইখানেই আধুনিক বাংলা গানের ধারার সঙ্গে কবিয়ালদের গানের তফাৎ। আধুনিক বাংলা গান হিসেবে একমাত্র আমার রচনাগুলিকে রাখা যেতে পারে। আমি এই ছবির প্রেক্ষিতে বলছি। “প্রথম আলোয় ফেরা” গানটিকে প্রথমে না রেখে “জাতিস্মর” গানটিকে রাখা হলে একটা উপযুক্ত ভূমিকা তৈরি হতে পারত, লোকে গানটি শুনতও। ওই গানটি আসছে সব শেষে, গল্প তখন শেষ (অন্তত সাধারণ মানুষ সেভাবেই দেখবেন), গানের ওপর দিয়ে চলছে এই ছবিতে কে কোন্ ক্ষেত্রে অবদান রেখেছেন তার তালিকা। ফলে বেশিরভাগ দর্শক উঠতে শুরু করছেন, সশব্দে প্রেক্ষাগৃহ ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। দু’বার এটাই দেখলাম আমি। মুষ্টিমেয় কিছু মানুষ গানটি শেষ পর্যন্ত শুনছেন – এ-গানটি তাঁদের পরিচিত বলেই। – যাই হোক, আমার রচনা করা “সহসা এলে কি” আর “এ তুমি কেমন তুমি” আধুনিক বাংলা গান। অনুপমবাবুর এই গানটিও তার কাঠামো ও সুর-তালের বৈশিষ্টের দিক দিয়ে আধুনিক গানেরই সমগোত্রীয়, যদিও অনুপমবাবুর বেশিরভাগ গানের মতো এই গানটিও মোটামুটি গোটাগুটি পাশ্চাত্যের পপ্-এর আঙ্গিকে হওয়ায় এবং দেশের সংগীতের সংশ্রব এড়িয়ে যাওয়ায় এর “জাত” নিয়ে (খারাপ অর্থে নয়) তর্ক উঠতে পারে। সিদ্ধার্থবাবু ও সাকিবাবুর গান কাঠামো, চরিত্র, সুরতালছন্দ-বৈশিষ্ট ও গায়কীর দিকে দিয়ে ৯-এর দশক থেকে পশ্চিম বঙ্গে আর ৭-এর দশক থেকে বাংলাদেশে (আশ্চর্য, সার্বিক অজ্ঞতা হেতু পশ্চিমবঙ্গের ব্যাণ্ড-বিশারদরা বাংলাদেশেই যে এই আঙ্গিকটির উৎপত্তি তা বলেন না) যে বাংলা ব্যাণ্ড মিউজিক চলছে তারই আওতায়। হিন্দুস্তানি ও বাংলা সংগীত থেকে দূরে থাকা এবং পাশ্চাত্যের পপ্ ও রক্-এর একটি বিশেষ আঙ্গিককে বরণ করে নেওয়া (“রক্” কিন্তু বিভিন্ন ধরণের হয়, সলিলের “এই রোকো” এক ধরণের রক্, যা পাশ্চাত্যের কোনও ধাঁচার অন্ধ অনুকরণ নয়, যা এক স্বাধীন, দিশি সৃষ্টি, আমার গড়িয়াহাটার মোড় সমেত নানান গান ‘রক্’ আঙ্গিকের) একটি বিশেষ ধরণের গান, যা সহজ কথায় সজোরে গাওয়া হবে, যে গানে স্থায়ী-অন্তরা-সঞ্চারির বালাই থাকবে না, যার সঙ্গে প্রধানত ইলেকট্রিক গিটার, কীবোর্ড্স্ ও ড্রাম্স্ বাজবে বাংলাদেশ মুক্তি যুদ্ধের পর সেই দেশেই তৈরি হয়েছিল। এ-দেশের মহীনের ঘোড়াগুলি পপ্ আঙ্গিকটিকেই বেছে নিয়েছিলেন, রক্ নয়। সেইসঙ্গে মিশিয়েছিলেন তাঁরা আমেরিকা ও ব্রিটেনের তথাকথিত “ফোক সঙ”-এর ধরণ। মহীনের ঘোড়াগুলি অপেশাদার ছিলেন, বাংলাদেশের রক্ ব্যাণ্ড কিন্তু গোড়া থেকেই পেশাদার। আর আধুনিক বাংলা গানের সঙ্গে কাঠামো ও সুরতালছন্দ-গায়কীর দিক দিয়ে কোনও মিল আজম খান-প্রবর্তিত বাংলা রক্ বা মহীনের ঘোড়াগুলির গানের (অল্পই বেঁধেছিলেন তাঁরা) ছিল না। আমি আবার সম্পূর্ণভাবে আধুনিক বাংলা গানের লোক – আধুনিক বাংলা গান, যার পরিসর পাশ্চাত্যের রক্ ও পপের চেয়ে অনেক বড়।
যাই হোক, বাংলা ভাষায় গাওয়া গানের এক নতুন নিদর্শন হিসেবে অনুপমবাবু এবং সিদ্ধার্থবাবু-সাকিবাবুর গানের অন্তর্ভুক্তি সম্ভবত আজকের এক-শ্রেণীর নবীনদের আকর্ষণ করা ও তাঁদের চাহিদা মেটানোর লক্ষ্যে। এইখানে একটি সমস্যা রয়েছে। ব্যন্ডেমোনিয়ম আসরে, যেখানে প্রতিষ্ঠিত বাংলা রক্ ব্যাণ্ডের লীলাভূমি, “এ তুমি কেমন তুমি”র মতো গানের স্থান থাকার কথা নয়। বাংলার রক্ সম্রাট আজম খানের আমল থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত এমন কোনও বাংলা ব্যাণ্ড আসেননি যাঁরা “এ তুমি কেমন তুমি”র মতো নিপাট আধুনিক বাংলা গান বানিয়েছেন বা বানাতে পেরেছেন বা (তার চেয়েও যা জরুরি) বানাতে চেয়েছেন। চাইতে গেলেও তো একটা ক্ষমতা থাকতে হবে। বাংলা ব্যাণ্ডের শিল্পীরা বাংলা আধুনিক গানের প্রশিক্ষণ নিয়েছেন বলে তাঁদের গান শুনে মনে হয় না। তাঁরা এই ধারাতেই নেই – অন্তত তাঁদের কাজ তা বলে না। এমন হতে পারে যে সৃজিত কবিয়ালদের বৃন্দ-গান-বাজনার ধরণ থেকে আজম খান-পরবর্তী বাংলা রক্ ব্যাণ্ডের মধ্যকার একটা ধারাবাহিকতার ইঙ্গিত দিতে চেয়েছেন। ঠিক জানি না। এ-বিষয়ে আমায় তিনি কিছু বলেননি। যদি তিনি সেটাই করতে চেয়ে থাকেন তাহলে আমার গানের উপস্থিতি মোটের ওপর অপ্রাসঙ্গিক। কারণ, আমার গান সমবেত গান-বাজনার বিষয় নয়। অনুপমবাবুর গানের ধরণও যা বুঝেছি “সোলো।” তাহলে অনুপমবাবুর এই গানটিও আমার গানের মতোই পরিহারযোগ্য এই ছবিতে। তবে, অনুপমবাবুর গানেও অতীত জন্মের কথা বলা আছে, যদিও “জাতিস্মর”- ধাঁচে নয়। কাজেই সৃজিত তাঁর গানটি রাখতেই পারতেন। কিন্তু “প্রথম আলোয় ফেরা” আর “এ তুমি কেমন তুমি” সঙ্গীত-প্রয়োগের যুক্তিতে প্রশ্নাসাপেক্ষ। রোহিতকে যদি ব্যাণ্ডেমোনিয়ম-পরিচালিকাকে গান গেয়ে ভজাতেই হয় তাহলে ছবির ঐ পরিসরে তাঁকে বাংলা রক্ আঙ্গিকেই তো গাইতে হবে, বাজাতে হবে। হঠাৎ বাংলা কীর্তন ও পল্লীগীতি এবং আধুনিক গানের চারিত্র মাখা “এ তুমি কেমন তুমি” ঐ আসরে কেন? এই গানের যে যন্ত্রানুষঙ্গ (সম্পূর্ণ পাশ্চাত্যের ধ্রুপদী সংগীতের ধ্বনি-বৈশিষ্টসম্বলিত) তাও তো “রক্” আঙ্গিকে নয়, আধুনিক বাংলা সংগীতের স্বীকৃত চারিত্র সেখানেও, কারণ তিনের দশক থেকেই পাশ্চাত্যের ধ্রুপদী সংগীতের কিছু কিসিম, ধরণ আধুনিক বাংলা গানের যন্ত্রাণুষঙ্গে শোনা যেতে থাকে। – আমার মনে হয় না, সৃজিত তাঁর ছবিতে সংগীতের ইতিহাস ভূগোল সমাজতত্ত্ব এইসব ঘাঁটাঘাঁটি করতে চেয়েছেন। তিনি একটি জনপ্রিয় ছবি করতে চেয়েছেন, যেখানে কবিয়ালদের গান থাকবে, কারণ কুশল হাজরা জন্মান্তরিত যদুভট্ট নন, গোপেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায়ও নন। তিনি জন্মান্তরিত এনটনি কবিয়াল। – মজার কথা হলো, এখন পর্যন্ত লোকমুখে যা শুনছি – “এ তুমি কেমন তুমি” গানটাই, যাকে বলে, লেগে গিয়েছে। লোকের হলোটা কী? একটা খিটকেল বুড়োর তৈরি নেহাতই সাদামাটা, পাতি আধুনিক বাংলা গান এতো লোকের ভাল লাগছে? আজকের যুগের আসরে বাংলা ব্যাণ্ডের আবেদনটার তাহলে হলোটা কী? বুড়ো বয়সে, এখনও সঙ্গীতশিক্ষার্থী, সংগীত ও সমাজ-সময়ের সম্পর্ককে বুঝতে চাওয়া এই আমিটা প্রশ্ন রাখছে, বুঝতে চাইছে।
২৫শে জানুয়ারি, ২০১৪





























